সভ্যতার সূচনা থেকেই নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে ডানামেলে উড়ে বেড়ানোর এক অদম্য আকুলতা মানুষকে তাড়িত করেছে। সুপ্রাচীন রূপকথা আর আব্বাস ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়নচেষ্টা থেকে শুরু করে রাইট ভাতৃদ্বয়ের ঐতিহাসিক আবিষ্কার, জেট ইঞ্জিনের যুগ, আর আজকের আধুনিক অ্যারোস্পেস ও অ্যাভিওনিক্স—প্রযুক্তির এই বিবর্তন আসলে সীমানা পেরিয়ে বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধার এক অনন্য বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রা। বাতাসের বাধা জয় করে উড্ডয়নের এই সক্ষমতা কেবল যান্ত্রিক সাফল্য নয়; এটি মানুষের অদম্য কৌতূহল, বিজ্ঞানভাবনা ও অসীম আকাশকে স্পর্শ করার এক সুদীর্ঘ মানবিক প্রজ্ঞার ফসল।
আমার কাছে এভিয়েশন বা বিমানবিদ্যা কেবল একটি উড়োজাহাজ চালানো, ককপিটের সুইচ-বোতাম কিংবা হ্যাঙ্গারের রক্ষণাবেক্ষণের হিসাব-নিকাশ নয়। এভিয়েশন হলো অ্যারোডাইনামিক্স, থার্মোডাইনামিক্স, পদার্থবিজ্ঞান, ইলেকট্রনিক্স, আবহাওয়া বিজ্ঞান ও সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার এক নিখুঁত মেলবন্ধন—যা যুগ যুগ ধরে অর্জিত মানবপ্রজ্ঞার (Wisdom) দৃশ্যমান রূপ। একটি বিমান কেবল মানুষকে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে নিয়ে যায় না, বরং তা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে, জরুরি মানবসেবা পৌঁছে দেয় এবং বিশ্বমানবাঁচলকে এক সুসংবদ্ধ সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ করে। তাই এভিয়েশন শিক্ষা কেবল বৈমানিক বা মেকানিক তৈরির পাঠ নয়; এটি নিখুঁত একাগ্রতা, সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধ, জীবনরক্ষা ও টেকসই বৈশ্বিক গতিশীলতাকে (Mobility) একসূত্রে বাঁধার এক গভীর সাধনা।
ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো বৈমানিক, অ্যারোনটিক্যাল প্রকৌশলী বা এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ নই; বিমান পরিচালনা বা অ্যারোস্পেসের জটিল টেকনিক্যাল বিদ্যা আমার জানা নেই। তবে বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির একজন অনুরাগী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে উপলব্ধি করেছি—আমাদের দেশের তরুণদের মাঝে মেধা ও সাহসের কোনো কমতি নেই। অভাব শুধু সেই প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিকমানের শিক্ষাকাঠামোর, যা তাদের মেধাকে আধুনিক এভিয়েশন থিওরি, অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাভিওনিক্স, ফ্লাইট সেফটি, এয়ারপোর্ট ম্যানেজমেন্ট এবং ভবিষ্যতের ড্রোন ও মহাকাশ প্রযুক্তির সঙ্গে সঠিক উপায়ে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে।
ঠিক এই চিন্তা থেকেই ‘এভিয়েশন গুরুকুল’ (aviation.gurukul.edu.bd)-এর যাত্রা। আমি চাই, এখানে আমাদের তরুণেরা এভিয়েশন সায়েন্সের মৌলিক তত্ত্ব, উড্ডয়ন-ইতিহাস এবং বিশ্বমানের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পাক। ক্লাসিক্যাল অ্যারোনটিক্স থেকে শুরু করে আধুনিক বাণিজ্যিক বিমান চলাচল, অ্যাভিওনিক্স, বিমান নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের গ্রিন এভিয়েশন—সবকিছুর পেছনের বৈজ্ঞানিক দর্শন ও প্রযুক্তিকে তারা যেন তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয়ভাবেই অনুধাবন করতে পারে, তেমনই একটি উন্মুক্ত ও চর্চামুখী পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রি হলো অন্যতম অতি-গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান একটি ক্ষেত্র। বিশ্বজুড়ে আজ দক্ষ পাইলট, অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাভিওনিক্স টেকনিশিয়ান, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার ও এভিয়েশন ম্যানেজারদের চাহিদা অসীম। আমাদের তরুণেরা যদি আন্তর্জাতিক মানের এভিয়েশন প্রযুক্তি ও কৌশল সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারে, তবে তারা কেবল দেশের এভিয়েশন খাতকেই সমৃদ্ধ করবে না, বরং বৈশ্বিক এভিয়েশন শিল্পেও বাংলাদেশের তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে দেবে।
রাতারাতি একটি দেশের বিমান চলাচল খাত বা এভিয়েশন শিক্ষার চিত্র বদলে দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়, তা আমি জানি। তবে প্রতিটি ঐতিহাসিক সফরের পেছনে থাকে একটি ছোট শুরু। ‘এভিয়েশন গুরুকুল’ সেই দীর্ঘ পথেরই এক বিনীত পদক্ষেপ—যেখানে এভিয়েশন বিদ্যাকে দেখা হবে প্রযুক্তিকে জানার, প্রজ্ঞাকে লালন করার, সীমানা পেরিয়ে সংযোগ স্থাপনের এবং এক নিরাপদ ও গতিশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে।
তবে আগের মতোই একটি সত্য অকপটে স্বীকার করতে চাই—আমি হয়তো কেবল এই সুবিশাল উদ্যোগের সূচনাটুকু করলাম, কিন্তু একে কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক, টেকনিক্যাল ও আন্তর্জাতিক মানের উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া আমার একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার নিজের কাজের ক্ষেত্র ও আগ্রহের পরিধি অত্যন্ত বিচিত্র ও ছড়ানো-ছিটানো—যা আমার একটি বড় ব্যক্তিগত দুর্বলতা। নানামুখী ভাবনায় মন ছড়িয়ে থাকার কারণে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘদিন টানা পুরো মনোযোগ ধরে রাখা আমার একটা স্বভাবজাত সীমাবদ্ধতা। তাই কেবল আমাকে দিয়ে এই জটিল ও বিশেষায়িত বৈজ্ঞানিক আয়োজন খুব বেশি দূর এগোতে পারবে না।
তাই দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত বৈমানিক (পাইলট), অ্যারোনটিক্যাল ও অ্যাভিওনিক্স প্রকৌশলী, এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও এয়ারলাইন শিল্পের প্রজ্ঞাবান বিশেষজ্ঞদের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ আহ্বান—আপনারা এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হোন, এর শিক্ষাক্রম ও গবেষণায় দিকনির্দেশনা দিন এবং ‘এভিয়েশন গুরুকুল’-কে নিজেদের প্রতিষ্ঠান ভেবে আপন করে নিন। আপনাদের অভিজ্ঞ হাত, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও কারিগরি প্রজ্ঞার আলোতেই এই স্বপ্ন পূর্ণতা পাক এবং কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যাক।
— সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রতিষ্ঠাতা ও মূল উদ্যোক্তা,
এভিয়েশন গুরুকুল