আকাশযান বা এয়ারক্রাফট (Aircraft) বলতে এমন সব যানকে বোঝায় যা বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের (সাধারণত বাতাস) ওপর ভর করে বা বাতাসের প্রতিক্রিয়া ব্যবহার করে উড়তে সক্ষম। সহজ কথায়, মানুষের তৈরি যে কোনো যান যা পৃথিবী পৃষ্ঠের ওপরে শূন্যে ভাসমান থেকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত বা নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করতে পারে, তাই আকাশযান।
অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এভিয়েশন শিল্পে আকাশযানের শ্রেণিবিভাগ অত্যন্ত ব্যাপক। এটি শুধুমাত্র যানের আকার বা আকৃতির ওপর নির্ভর করে না; বরং উড্ডয়ন নীতি (Principle of Flight), চালিকাশক্তি (Propulsion), ব্যবহারিক উদ্দেশ্য এবং ল্যান্ডিং গিয়ার বা অবতরন ক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে এই প্রকারভেদ করা হয়। এই শ্রেণিবিভাগ বোঝা এভিয়েশন অনুরাগী, প্রকৌশলী এবং বৈমানিকদের জন্য অপরিহার্য।
আকাশযানের সবচেয়ে মৌলিক এবং বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিভাগটি করা হয় উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ‘লিফট’ বা ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরির পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে। এই নীতি অনুযায়ী আকাশযানকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়: ১. বাতাসের চেয়ে হালকা (Lighter-than-Air) বা অ্যারোস্ট্যাট (Aerostats) ২. বাতাসের চেয়ে ভারী (Heavier-than-Air) বা অ্যারোডাইন (Aerodynes)
নিচে উড্ডয়ন বিজ্ঞানের এই মূল ধারাসহ অন্যান্য ব্যবহারিক শ্রেণিবিভাগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

বাতাসের চেয়ে হালকা আকাশযান (Lighter-than-Air / Aerostats)
এই প্রকারের আকাশযানগুলো আর্কিমিডিসের প্লবতা নীতি (Buoyancy principle) ব্যবহার করে ওড়ে। এরা বাতাসের চেয়ে কম ঘনত্বের গ্যাস (যেমন হিলিয়াম বা হাইড্রোজেন) অথবা গরম বাতাস দ্বারা পূর্ণ একটি বিশাল থলে বা এনভেলপ ব্যবহার করে। যেহেতু যানের সামগ্রিক ওজন সমপরিমাণ বাতাসের ওজনের চেয়ে কম হয়, তাই এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপরে উঠে ভাসতে থাকে।
এই শ্রেণির আকাশযানের মধ্যে রয়েছে:
বেলুন (Balloons)
বেলুন হলো চালিকাশক্তিহীন (Non-powered) অ্যারোস্ট্যাট, যা বাতাসের স্রোতের সাথে ভেসে চলে। এর কোনো নির্দিষ্ট দিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকে না।
- মুক্ত বেলুন (Free Balloons): এগুলো সাধারণত গরম বাতাস (Hot Air Balloon) বা গ্যাস (Gas Balloon) দ্বারা চালিত হয়। বিনোদনমূলক উড্ডয়ন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা (যেমন আবহাওয়া বেলুন) এবং পর্যটনে এর ব্যবহার রয়েছে।
- আবদ্ধ বেলুন (Tethered/Moored Balloons): এগুলো তার বা রশির সাহায্যে ভূমির সাথে আবদ্ধ থাকে। নির্দিষ্ট উচ্চতায় নজরদারি, বিজ্ঞাপন বা পর্যটনের জন্য এগুলো ব্যবহৃত হয়।
এয়ারশিপ (Airships / Dirigibles)
বেলুনের সাথে এয়ারশিপের মূল পার্থক্য হলো, এয়ারশিপে চালিকাশক্তি (ইঞ্জিন এবং প্রপেলার) এবং দিক নিয়ন্ত্রণের জন্য রাডার (Rudder) বা এলিভেটর থাকে। অর্থাৎ, পাইলট ইচ্ছামতো এয়ারশিপকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারেন।
- কাঠামো অনুযায়ী প্রকারভেদ:
- নন-রিজিড (Non-rigid/Blimps): এর কোনো অভ্যন্তরীণ শক্ত কাঠামো থাকে না। গ্যাসের চাপই এর আকৃতি ধরে রাখে।
- সেমি-রিজিড (Semi-rigid): আকৃতি ধরে রাখার জন্য নিচের দিকে একটি আংশিক শক্ত কাঠামো থাকে।
- রিজিড (Rigid): একটি পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ ধাতব কাঠামো (Framework) থাকে, যার ভেতর গ্যাসের থলেগুলো রাখা হয়। ঐতিহাসিক ‘জেপেলিন’ (Zeppelin) ছিল রিজিড এয়ারশিপের উদাহরণ।
নিরাপত্তা সতর্কতা:
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এয়ারশিপে সস্তা কিন্তু দাহ্য হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহারের ফলে ‘হিন্ডেনবার্গ’ (Hindenburg) দুর্যোগের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছিল। আধুনিক এয়ারশিপে নিরাপত্তার স্বার্থে শুধুমাত্র নিষ্ক্রিয় এবং অদাহ্য হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

বাতাসের চেয়ে ভারী আকাশযান (Heavier-than-Air / Aerodynes)
বিশ্বের প্রায় ৯৯% আধুনিক আকাশযান এই শ্রেণিভুক্ত। এই যানগুলো বাতাসের চেয়ে ভারী হওয়ায় এরা প্লবতার ওপর ভর করে উড়তে পারে না। ওড়ার জন্য এদের ডানার (Wing) ওপর দিয়ে দ্রুতগতিতে বাতাস প্রবাহিত করে বায়ুগতিবিদ্যার (Aerodynamics) নীতি অনুযায়ী ‘লিফট’ বা ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি করতে হয়। এই লিফট যখন যানের ওজনকে অতিক্রম করে, তখনই এটি উড্ডয়ন করে।
উত্থাপনকারী সারফেস বা ডানার ধরণের ওপর ভিত্তি করে এদেরকে আবার প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
১. স্থির ডানাযুক্ত (Fixed-Wing) আকাশযান
২. ঘূর্ণায়মান ডানাযুক্ত (Rotary-Wing/Rotorcraft) আকাশযান

স্থির ডানাযুক্ত আকাশযান (Fixed-Wing Aircraft)
এই যানগুলোতে উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজনীয় লিফট তৈরির জন্য স্থির বা অনড় ডানা থাকে। যানটি যখন ইঞ্জিনের ধাক্কায় (Thrust) সামনে এগিয়ে যায়, তখন ডানার বিশেষ আকৃতির (Airfoil) কারণে এর ওপর ও নিচে বাতাসের চাপের পার্থক্য তৈরি হয় এবং লিফট উৎপন্ন হয়।
এর প্রকারভেদগুলো হলো:
অ্যারোপ্লেন বা উড়োজাহাজ (Aeroplanes / Airplanes)
এটি সবচেয়ে পরিচিত স্থির ডানাযুক্ত আকাশযান, যাতে উড্ডয়নের জন্য ইঞ্জিন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য স্থির ডানা থাকে। যাত্রী পরিবহন, পণ্য পরিবহন (Cargo), সামরিক অভিযান, কৃষি কাজ এবং প্রশিক্ষণে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। অ্যারোপ্লেনকে আবার ইঞ্জিনের ধরণের ওপর ভিত্তি করে ভাগ করা যায়:
- পিস্টন ইঞ্জিন (Piston Engine): সাধারণত ছোট, ধীরগতির এবং কম উচ্চতায় উড়ন্ত ব্যক্তিগত বা প্রশিক্ষণ বিমানের জন্য ব্যবহৃত হয় (প্রপেলার চালিত)।
- টার্বোপ্রপ (Turboprop): জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করে প্রপেলার ঘোরানো হয়। মাঝারি দূরত্ব এবং আঞ্চলিক রুটের বাণিজ্যিক বিমানের জন্য উপযোগী।
- জেট ইঞ্জিন (Jet Engine/Turbofan): উচ্চগতি এবং উচ্চতায় ওড়ার জন্য উপযুক্ত। আধুনিক দূরপাল্লার যাত্রীবাহী এবং সামরিক ফাইটার বিমানে ব্যবহৃত হয়।
গ্লাইডার ও সেইলপ্লেন (Gliders & Sailplanes)
এগুলো মূলত ইঞ্জিনবিহীন স্থির ডানাযুক্ত আকাশযান।
- গ্লাইডার (Gliders): সাধারণত কোনো মোটরচালিত বিমান দ্বারা টেনে বা উইঞ্চের সাহায্যে নির্দিষ্ট উচ্চতায় তুলে দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। এটি মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে এবং বাতাসের বাধা ব্যবহার করে সামনে এগিয়ে যায়।
- সেইলপ্লেন (Sailplanes): এগুলো অত্যন্ত উন্নতমানের গ্লাইডার। এগুলো বায়ুমণ্ডলের ঊর্ধ্বমুখী উষ্ণ বাতাসের প্রবাহ (Thermals) বা পাহাড়ের ঢালে বাধা পেয়ে উপরে ওঠা বাতাসকে (Ridge lift) ব্যবহার করে ইঞ্জিন ছাড়াই দীর্ঘক্ষণ আকাশে ভেসে থাকতে পারে, এমনকি উচ্চতাও বৃদ্ধি করতে পারে।
ঘুড়ি (Kites)
ঘুড়ি হলো প্রাচীনতম স্থির ডানাযুক্ত আকাশযান। এটি বাতাসের প্রবাহে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে লিফট তৈরি করে। ঘুড়ি সাধারণত সুতার সাহায্যে ভূমির সাথে আবদ্ধ থাকে এবং বাতাসের টানে উড়তে থাকে। বিনোদন ছাড়াও অতীতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সামরিক পর্যবেক্ষণে ঘুড়ি ব্যবহৃত হতো।

ঘূর্ণায়মান ডানাযুক্ত আকাশযান (Rotary-Wing Aircraft / Rotorcraft)
এই যানগুলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য স্থির ডানার ওপর নির্ভর করে না। পরিবর্তে, এদের এক বা একাধিক অনুভূমিক পাখা বা রোটর ব্লেড (Rotor Blades) দ্রুতগতিতে ঘুরে লিফট তৈরি করে। রোটর ব্লেডগুলো মূলত ঘুরন্ত ডানা হিসেবে কাজ করে।
এর প্রকারভেদগুলো হলো:
হেলিকপ্টার (Helicopters)
সবচেয়ে সাধারণ রোটোক্র্যাফট। এর রোটর ব্লেডগুলো ইঞ্জিন দ্বারা চালিত হয় এবং এগুলো একাধারে লিফট এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার ধাক্কা (Thrust) উভয়ই তৈরি করে। হেলিকপ্টার সোজাসুজি উপরে উঠতে ও নামতে পারে (VTOL – Vertical Take-Off and Landing), এক জায়গায় স্থির হয়ে ভাসতে পারে (Hovering) এবং যেকোনো দিকে (সামনে, পিছনে, ডানে, বামে) উড়তে পারে।

জায়ারোপ্লেন বা অটোজায়রো (Gyroplanes / Autogyros)
এগুলো একটি কৌতূহলী মিশ্রণ। এতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যারোপ্লেনের মতো একটি প্রপেলার (ইঞ্জিন চালিত) থাকে। কিন্তু উপরে ওঠার লিফট তৈরির জন্য একটি মুক্তভাবে ঘূর্ণায়মান রোটর (Freewheeling Rotor) থাকে, যা ইঞ্জিনের সাথে যুক্ত থাকে না। সামনের গতির কারণে বাতাস রোটরের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে একে ঘোরায় (Autorotation নীতি), যা লিফট তৈরি করে। এটি হেলিকপ্টারের মতো স্থিরভাবে ভাসতে বা সোজাসুজি উপরে উঠতে পারে না।
অন্যান্য বিশেষ ধরণের আকাশযান
ওরনিথপ্টার (Ornithopters)
এগুলো এমন এক ধরণের আকাশযান যা পাখির মতো ডানা ঝাপটে (Flapping Wings) উড়তে চেষ্টা করে। মানুষের তৈরি ওরনিথপ্টারগুলো সাধারণত খুব ছোট হয় (Micro Air Vehicles) এবং এগুলো মূলত গবেষণা বা খেলনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বড় আকারের মানুষবাহী ওরনিথপ্টার তৈরি করা প্রকৌশলগতভাবে অত্যন্ত জটিল এবং অদক্ষ।
রকেট (Rockets)
রকেট একটি বিশেষ ধরণের আকাশযান যা বায়ুমণ্ডলের বাতাসের ওপর ভর করে ওড়ে না। এটি নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র (Action-Reaction) ব্যবহার করে। রকেটের ভেতরে থাকা জ্বালানি দহনের ফলে সৃষ্ট উচ্চচাপের গ্যাস প্রবল বেগে পিছন দিকে নির্গত হয়, যা রকেটকে বিপরীত দিকে (সামনে) প্রবল ধাক্কা বা ঘাতবল (Thrust) প্রদান করে। রকেট নিজের সাথে অক্সিজেন বহন করে, তাই এটি বায়ুমণ্ডলের বাইরে বা মহাকাশেও চলতে সক্ষম।
অবতরণ ক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে শ্রেণিবিভাগ
উড়োজাহাজ কোথায় ল্যান্ড বা টেক-অফ করে, তার ওপর ভিত্তি করে একে ভাগ করা হয়:
- ল্যান্ডপ্লেন (Landplanes): শুধুমাত্র সমতল ভূমি বা বিমানবন্দরের রানওয়েতে অবতরণ ও উড্ডয়ন করতে পারে। এতে চাকাযুক্ত ল্যান্ডিং গিয়ার থাকে।
- সিপ্লেন (Seaplanes): শুধুমাত্র পানির ওপর (সমুদ্র, লেক) অবতরণ ও উড্ডয়ন করতে সক্ষম। চাকার বদলে এদের নিচে ভাসমান পন্টুন বা ফ্লোট (Float) থাকে।
- ফ্লোটপ্লেন (Floatplanes): সাধারণ বিমানের নিচে ফ্লোট লাগানো থাকে।
- ফ্লাইং বোট (Flying Boats): যানের মূল বডি বা ফিউসেলেজটিই একটি নৌকার মতো আকৃতির হয়, যা পানির ওপর ভাসে।
-
অ্যামফিবিয়ান (Amphibians): এগুলো ভূমি এবং পানি উভয় স্থানেই অবতরণ ও উড্ডয়ন করতে সক্ষম। এদের চাকা এবং ফ্লোট উভয় ধরণের ব্যবস্থা থাকে, যা পাইলট প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে পারেন।
চালনা পদ্ধতি ও ব্যবহারিক উদ্দেশ্য অনুযায়ী শ্রেণিবিভাগ
- সোলার প্লেন (Solar Planes): ডানায় থাকা সোলার প্যানেল থেকে প্রাপ্ত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে বৈদ্যুতিক মোটর চালিত বিমান। এগুলো অত্যন্ত হালকা হয় এবং দীর্ঘক্ষণ আকাশে থাকতে পারে।
- ভি.টি.ও.এল (VTOL – Vertical Take-Off and Landing): এমন বিমান যা হেলিকপ্টারের মতো সোজাসুজি উপরে উঠতে পারে এবং পরে সাধারণ বিমানের মতো দ্রুতগতিতে সামনে উড়তে পারে (যেমন: F-35 Lightning II फाइटर জেট)।
- ড্রোন বা ইউএভি (Drones / UAV – Unmanned Aerial Vehicles): মানুষবিহীন চালিত আকাশযান। এগুলো দূরনিয়ন্ত্রণ (Remote Control) বা প্রি-প্রোগ্রামড অটোপাইলট সিস্টেমের মাধ্যমে ভূমি থেকে পরিচালিত হয়। সামরিক নজরদারি থেকে শুরু করে পণ্য সরবরাহ এবং ফটোগ্রাফিতে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. আকাশযান এবং অ্যারোপ্লেনের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: আকাশযান (Aircraft) হলো একটি সাধারণ শব্দ যা বাতাসে উড়তে সক্ষম এমন যেকোনো যানকে বোঝায় (যেমন বেলুন, হেলিকপ্টার, গ্লাইডার, উড়োজাহাজ)। অন্যদিকে, অ্যারোপ্লেন বা উড়োজাহাজ হলো আকাশযানের একটি নির্দিষ্ট প্রকার, যা বাতাসের চেয়ে ভারী, স্থির ডানাযুক্ত এবং ইঞ্জিন চালিত।
২. হেলিকপ্টার কীভাবে রানওয়ে ছাড়াই উড়তে পারে?
উত্তর: হেলিকপ্টার ওড়ার জন্য সামনে এগিয়ে যাওয়ার গতির ওপর নির্ভর করে না। এর ইঞ্জিন চালিত রোটর ব্লেডগুলো দ্রুতগতিতে ঘুরে প্রয়োজনীয় ঊর্ধ্বমুখী বল বা লিফট তৈরি করে। তাই এটি সোজাসুজি উপরে উঠতে (VTOL) এবং এক জায়গায় স্থির হয়ে ভাসতে (Hover) পারে।
৩. গ্লাইডার এবং সেইলপ্লেনের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: উভয়ই ইঞ্জিনবিহীন আকাশযান। তবে সেইলপ্লেন হলো উন্নতমানের গ্লাইডার যা বায়ুমণ্ডলের ঊর্ধ্বমুখী বাতাসের প্রবাহকে (যেমন থার্মাল) ব্যবহার করে দীর্ঘক্ষণ আকাশে ভেসে থাকতে এবং উচ্চতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম। সাধারণ গ্লাইডার শুধুমাত্র ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে।
৪. এয়ারশিপ এবং বেলুনের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: উভয়ই বাতাসের চেয়ে হালকা। বেলুনের কোনো ইঞ্জিন বা দিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকে না, এটি বাতাসের স্রোতে ভেসে চলে। এয়ারশিপে ইঞ্জিন এবং রাডার থাকে, ফলে পাইলট ইচ্ছামতো নির্দিষ্ট গন্তব্যে এটি চালনা করতে পারেন।
৫. ড্রোন বা UAV-কে কি আকাশযান বলা যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই। ড্রোন হলো মানুষবিহীন পরিচালিত আকাশযান (Unmanned Aerial Vehicle)। এগুলো আকাশযানের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে কারণ এরা বায়ুমণ্ডলে উড়তে সক্ষম।
৬. রকেট কি একটি আকাশযান?
উত্তর: রকেটকে আকাশযান বলা যেতে পারে, তবে এটি অন্যান্য এয়ারক্রাফটের চেয়ে ভিন্ন নীতিতে চলে। এটি ওড়ার জন্য বায়ুমণ্ডলের বাতাসের ওপর নির্ভর করে না; বরং নিজস্ব জ্বালানি দহনের ফলে সৃষ্ট ঘাতবল (Thrust) ব্যবহার করে ওড়ে, যা একে বায়ুমণ্ডলের বাইরে মহাকাশেও চলতে সক্ষম করে।
একনজরে:
- সংজ্ঞা: আকাশযান হলো বাতাসের ওপর ভর করে উড়তে সক্ষম মানুষের তৈরি যেকোনো যান।
- মৌলিক শ্রেণিবিভাগ: উড্ডয়ন নীতির ওপর ভিত্তি করে দুই প্রকার: বাতাসের চেয়ে হালকা (অ্যারোস্ট্যাট) এবং বাতাসের চেয়ে ভারী (অ্যারোডাইন)।
- Lighter-than-Air: প্লবতা নীতি ব্যবহার করে ওড়ে। উদাহরণ: বেলুন (চালকহীন), এয়ারশিপ (চালকযুক্ত)।
- Heavier-than-Air: বায়ুগতিবিদ্যা ব্যবহার করে লিফট তৈরি করে। প্রধানত দুই প্রকার: স্থির ডানাযুক্ত (অ্যারোপ্লেন, গ্লাইডার, ঘুড়ি) এবং ঘূর্ণায়মান ডানাযুক্ত (হেলিকপ্টার, জায়ারোপ্লেন)।
- কন্ট্রোল সারফেস: স্থির ডানাযুক্ত যানের দিক নিয়ন্ত্রণের জন্য এলিভেটর (পিচ), রাডার (ইয়), এবং এলিরন (রোল) থাকে। ঘূর্ণায়মান ডানাযুক্ত যানে রোটর ব্লেডের অ্যাঙ্গেল পরিবর্তন করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
- বিশেষ যান: রকেট ঘাতবল বা থ্রাস্ট ব্যবহার করে ওড়ে, বায়ুমণ্ডলের বাইরেও চলতে পারে। ড্রোন হলো মানুষবিহীন আকাশযান।
- অবতরণ ক্ষেত্র: ল্যান্ডপ্লেন (ভূমি), সিপ্লেন (পানি), অ্যামফিবিয়ান (উভয়)।
- গুরুত্ব: বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ বোঝা এভিয়েশন শিল্পের নিরাপত্তা, নকশা এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।